শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

সীমান্তে অস্থিরতা কাম্য নয়

আগস্ট বিপ্লবের পর থেকেই বাংলাদেশের সাথে বৃহত প্রতিবেশী ভারতের বড় ধরনের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। মূলত, নিকট প্রতিবেশী দেশটি ছাত্র-জনতার এই বিপ্লব কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি। ফলে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে রীতিমত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবিও রয়েছে সতর্কাবস্থায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীরা মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করছেন। মূলত, গত ১৫ বছরে ভারতীয় বিএসএফ বাংলাদেশের সাথে আগ্রাসী আচরণ করে এসেছে। পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যেও বিএসএফ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত যে আচরণ করছে, বাংলাদেশ সরকারও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে।
গত à§« আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার তিন দিন পর à§® আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। à§§à§© আগস্ট এই সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, ‘দেশের সীমান্তে ঢুকে মানুষ মারলেও পতাকা বৈঠক করে বলা হতো, সব ঠিক হয়ে গেছে। সেই দিন শেষ হয়ে গেছে। বিজিবির মতো একটা ফোর্সকে (বাহিনী) পিঠ দেখাতে বলেছে সীমান্তে। সীমান্তে আমাদের লোক মারে, বিজিবি পতাকা বৈঠক করতে বাধ্য হয়। আমি বলেছি, পিঠ দেখাবেন না। এনাফ ইজ এনাফ (যথেষ্ট হয়েছে)।’ যা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাহসী উচ্চারণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের গত পাঁচ মাসে সীমান্ত হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে নজরদারি বাড়িয়েছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সীমান্তে বিভিন্ন ঘটনায় পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছে দু’দেশের সরকার। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন, নজরদারির জন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র ও অত্যাধুনিক ক্যামেরা লাগাচ্ছে। যেখানে নদী বা অন্য কোনো কারণে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সুযোগ নেই, সেখানে নজরদারির জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরাসহ বিশেষ যন্ত্র স্থাপন করা হচ্ছে। যা ভারতীয় পক্ষের রীতিমত উস্কানি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটারের মধ্যে ভারত à§© হাজার ২৭১ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। তারা বাকি ৮৮৫ কিলোমিটারজুড়ে বিভিন্ন অংশে স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাটের তিনবিঘা করিডর, নওগাঁর পত্নীতলা, ফেনী, কুষ্টিয়া ও কুমিল্লায় ভারত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজ শুরু করে। বিভিন্ন সীমান্তে বাংলাদেশী কৃষকদের চাষ ও সেচকাজে বাধা দিচ্ছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
৭ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা সীমান্তের ওপারে ভারতের সুখদেবপুর সীমান্তে বিএসএফের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। জানা যায়, সেখানে সীমান্তে কোনো কাঁটাতারের বেড়া ছিল না এবং সেই বেড়া তৈরির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ভারতের অভ্যন্তরে ১০০ গজ ভেতরে মাটি খোঁড়া হচ্ছিল। এ কারণে বাংলাদেশের তীব্র আপত্তির মুখে ভারতীয়রা কাজটি বন্ধ করে দেয়। এদিকে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ায়, এমন উসকানিমূলক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার জন্য ভারতকে পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ঢাকায় দেশটির হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে এ পরামর্শ দেন পররাষ্ট্রসচিব। সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সাম্প্রতিক কার্যকলাপ নিয়ে পররাষ্ট্রসচিব বাংলাদেশ সরকারের গভীর উদ্বেগের কথা জানান হাইকমিশনারকে।
ওই দিন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের জিরো লাইন থেকে দেড়শ’ গজের মধ্যে ভারতকে কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না। এরমধ্যে ৩টি জেলার পাঁচটি সীমান্তে বিএসএফকে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে। ২০১০-২৩ সাল পর্যন্ত ভারত সীমান্তে কিছু অসম কাজ করা হয়েছে, যেগুলো ভারতের করা উচিত হয়নি। কিন্তু আগের সরকার সে সুযোগ ভারতকে দিয়েছে। এই অবস্থায় আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক হবে বলে জানা গেছে। বৈঠকে সীমান্তে হত্যা, কাঁটাতারের বেড়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তার ভাষায়, ‘আলোচনা করব, যাতে কাজগুলো বন্ধ করা যায়। সীমান্তে প্রচুর শক্তি আছে। জনগণ হলো বড় শক্তি।’
বিজিবি সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সীমান্তে ২৪ জন বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে ভারত। আগের বছর ২০২৩ সালে নিহত হয়েছিলেন ২৯ জন। ২০২৪ সালে নিহত ২৪ জনের মধ্যে বিএসএফের হাতে ১৯ আর ভারতীয় নাগরিকদের হাতে ৫ জন বাংলাদেশি নিহত হন। এর মধ্যে ৫ আগস্টের আগে ১৯ জনকে এবং তারপর আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গত পাঁচ মাসে ৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে। সূত্র আরো জানিয়েছে, সীমান্তে নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে। চোরাচালান ও অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার রোধে টহলের পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর নানা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এতে সীমান্তে হত্যাও কিছুটা কমেছে।
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব পরবর্তী ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে যে আচরণ করছে তা কোন ভাবেই কোন প্রতিবেশীসূলভ আচরণ নয়। আমরা আশা করবো উভয় দেশই আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুসরণ করে নিজেদের করণীয় নির্ধারণ করবে। সীমান্তে অস্থিরতা কোন ভাবেই কাম্য নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ